উদ্ভিদ

থানকুনি

থানকুনি (Centella asiatica) বাংলাদেশের একটি পরিচিত ঔষধি উদ্ভিদ, যা ঐতিহ্যগতভাবে ক্ষত নিরাময়, ত্বকের সমস্যা ও স্মৃতিশক্তির উন্নতির জন্য ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এর প্রধান সক্রিয় উপাদান এশিয়াটিকোসাইড, মেডেক্যাসোসাইড ও এশিয়াটিক অ্যাসিড। এসব যৌগের ক্ষত নিরাময়, কোলাজেন উৎপাদন, প্রদাহ নিয়ন্ত্রণ, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট কার্যকারিতা ও স্নায়ু সুরক্ষায় সম্ভাব্য ভূমিকা রয়েছে। ক্ষত নিরাময় ও শিরাজনিত রক্তসঞ্চালনের সমস্যায় সীমিত মানব গবেষণায় উপকারের ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও স্মৃতিশক্তিসহ অন্যান্য কার্যকারিতার ক্ষেত্রে আরও উন্নত ক্লিনিক্যাল গবেষণা প্রয়োজন।

১. উদ্ভিদের পরিচিতি

১.১ বিস্তারিত তথ্য

থানকুনি

থানকুনি বাংলাদেশের পরিচিত একটি ছোট, বহুবর্ষজীবী ও মাটিতে ছড়িয়ে বেড়ে ওঠা ভেষজ উদ্ভিদ। এর সরু লতানো কাণ্ডের গাঁট থেকে শিকড় বের হয়। পাতা সাধারণত গোলাকার থেকে বৃক্কাকৃতির, কিনারা খাঁজকাটা এবং দীর্ঘ বোঁটাযুক্ত। ছোট সাদা থেকে হালকা গোলাপি ফুল পাতার গোড়ার কাছে জন্মায়। স্যাঁতসেঁতে মাটি, পুকুরপাড়, মাঠের কিনারা ও আংশিক ছায়াযুক্ত স্থানে এটি জন্মাতে দেখা যায়। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বহু অঞ্চলে উদ্ভিদটি পরিচিত। ঔষধি গবেষণায় প্রধানত পাতা ও মাটির ওপরের অংশ ব্যবহৃত হয়; কিছু ঐতিহ্যগত প্রস্তুতিতে সম্পূর্ণ উদ্ভিদ ব্যবহার করা হয়। সঠিক প্রজাতি শনাক্ত করা জরুরি, কারণ কাছাকাছি দেখতে অন্য উদ্ভিদের রাসায়নিক গঠন ও নিরাপত্তা ভিন্ন হতে পারে। [1]

টেবিল ১. থানকুনির উদ্ভিদ পরিচিতি

পরিচিতির বিষয়তথ্য
বাংলা নামথানকুনি
ইংরেজি নামগোটু কোলা (Gotu kola), এশীয় পেনিওয়ার্ট (Asiatic pennywort)
স্বীকৃত বৈজ্ঞানিক নামCentella asiatica (L.) Urb.
পরিবারApiaceae (অ্যাপিয়েসি)
গণCentella (সেন্টেলা)
প্রজাতিC. asiatica
বর্গApiales (অ্যাপিয়ালিস)
উদ্ভিদের ধরনবহুবর্ষজীবী, লতানো ভেষজ উদ্ভিদ
ঔষধি কাজে ব্যবহৃত অংশপ্রধানত পাতা ও মাটির ওপরের অংশ; কিছু প্রস্তুতিতে সম্পূর্ণ উদ্ভিদ
বাংলাদেশে প্রাপ্যতাস্যাঁতসেঁতে ও ছায়াযুক্ত স্থানে, বিশেষত জলাশয় ও ক্ষেতের আশপাশে

২. প্রধান ঔষধি গুণ

২.১ বিস্তারিত তথ্য

থানকুনির সবচেয়ে আলোচিত ঔষধি গুণ হলো ক্ষত নিরাময়ে সহায়ক সম্ভাবনা। উদ্ভিদটির কয়েকটি সক্রিয় যৌগ ত্বকের সংযোজক কলা তৈরি, ক্ষতস্থানের কোষের বৃদ্ধি এবং নতুন রক্তনালি গঠনের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে। কিছু মানব গবেষণায় উপকারের ইঙ্গিত থাকলেও ক্ষতের ধরন ও ব্যবহৃত প্রস্তুতি ভিন্ন হওয়ায় সব ধরনের ক্ষতের ক্ষেত্রে সমান ফল নিশ্চিত নয়। [2, 3]

শিরার রক্তসঞ্চালনজনিত সমস্যায় থানকুনির মাননিয়ন্ত্রিত নির্যাস নিয়ে মানব গবেষণা হয়েছে। বিশেষত পায়ের ভারীভাব, ফোলা ও অস্বস্তির মতো উপসর্গে সম্ভাব্য উপকারের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে গবেষণাগুলোর মান ও প্রতিবেদনগত সীমাবদ্ধতার কারণে নিশ্চিত চিকিৎসাগত সিদ্ধান্তের জন্য আরও উন্নত গবেষণা প্রয়োজন। [4]

প্রদাহবিরোধী ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট কার্যকারিতা থানকুনির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাক্ষেত্র। পরীক্ষাগার ও প্রাণী গবেষণায় এর কিছু উপাদান প্রদাহ-সংশ্লিষ্ট সংকেত এবং কোষের জারণজনিত ক্ষতির ওপর প্রভাব দেখিয়েছে। স্মৃতিশক্তি, মানসিক অবস্থা, স্নায়ু সুরক্ষা, রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ এবং জীবাণুরোধী কার্যকারিতা নিয়েও গবেষণা রয়েছে; তবে এসব ক্ষেত্রে অধিকাংশ প্রমাণ প্রাথমিক এবং মানুষের ওপর কার্যকারিতা প্রতিষ্ঠিত নয়। [5, 6, 7]

৩. ঐতিহ্যগত ও প্রচলিত ব্যবহার

৩.১ বিস্তারিত তথ্য

বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ায় থানকুনি শাক ও ভেষজ উদ্ভিদ হিসেবে পরিচিত। লোকজ ব্যবহারে পাতার রস, বাটা বা পাতা-সমৃদ্ধ খাবার পরিপাকতন্ত্রের অস্বস্তি, ত্বকের সমস্যা ও সাধারণ সুস্থতার উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়েছে। বিভিন্ন ঐতিহ্যগত চিকিৎসাব্যবস্থায় ক্ষত, ত্বকের যত্ন এবং স্মৃতিশক্তি-সম্পর্কিত ব্যবহারের উল্লেখ রয়েছে। এসব প্রচলিত ব্যবহারকে স্বতন্ত্রভাবে কার্যকারিতার প্রমাণ হিসেবে গণ্য করা যায় না; নির্যাসের ধরন, মাত্রা, বিশুদ্ধতা ও রোগের প্রকৃতি অনুযায়ী ফল পরিবর্তিত হতে পারে। [3]

৪. বিস্তারিত ঔষধি কার্যকারিতা ও সম্ভাব্য কার্যপ্রক্রিয়া

৪.১ ক্ষত নিরাময় ও কলা পুনর্গঠন

এশিয়াটিকোসাইড ও মেডেক্যাসোসাইড ত্বকের সংযোজক কলা তৈরির কোষকে সক্রিয় করা, কোলাজেন উৎপাদন এবং ক্ষতস্থানে নতুন রক্তনালি গঠনের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে। পরীক্ষামূলক গবেষণায় ক্ষত সংকোচন ও নতুন ত্বক গঠনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। মানব গবেষণার পদ্ধতিগত পর্যালোচনায় সম্ভাব্য উপকারের কথা বলা হলেও প্রস্তুতি ও ক্ষতের ধরন ভিন্ন ছিল। গভীর, সংক্রমিত বা ডায়াবেটিসজনিত ক্ষতে এটি প্রচলিত চিকিৎসার বিকল্প নয়। [5, 2, 3]

৪.২ ত্বকের সুরক্ষা ও দাগ

ত্বকের প্রদাহ কমানো, আর্দ্রতা ধরে রাখা এবং কোলাজেন পুনর্গঠনের মাধ্যমে থানকুনির কিছু প্রস্তুতি ত্বকের যত্নে ভূমিকা রাখতে পারে। ক্ষত-পরবর্তী দাগ ও ত্বকের স্থিতিস্থাপকতা নিয়ে ছোট গবেষণা রয়েছে। তবে সব প্রসাধনী পণ্যের কার্যকারিতা সমান নয়; সক্রিয় উপাদানের পরিমাণ ও প্রস্তুতপ্রণালি গুরুত্বপূর্ণ। সংবেদনশীল ত্বকে স্থানীয় অ্যালার্জি হতে পারে। [5, 2, 3]

৪.৩ শিরাজনিত রক্তসঞ্চালন ও পায়ের ফোলা

দীর্ঘস্থায়ী শিরাজনিত রক্তসঞ্চালনের সমস্যায় ক্ষুদ্র রক্তনালির দেয়াল ও তরল নিঃসরণের ওপর থানকুনির মাননিয়ন্ত্রিত ট্রাইটারপিনসমৃদ্ধ প্রস্তুতির প্রভাব নিয়ে গবেষণা হয়েছে। কয়েকটি মানব গবেষণায় পায়ের ফোলা, ভারীভাব ও অস্বস্তিতে উন্নতির ইঙ্গিত রয়েছে। তবে গবেষণার মানে ভিন্নতা এবং পক্ষপাতের ঝুঁকি রয়েছে। হঠাৎ এক পা ফুলে যাওয়া বা ব্যথা হলে জরুরি চিকিৎসা মূল্যায়ন প্রয়োজন। [4]

৪.৪ স্মৃতিশক্তি ও জ্ঞানীয় কার্যক্রম

থানকুনির কিছু উপাদান স্নায়ুকোষের জারণজনিত ক্ষতি, প্রদাহ এবং স্নায়ুকোষের পারস্পরিক সংযোগের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে। প্রাণী গবেষণায় শেখা ও স্মৃতিসংক্রান্ত ফল পাওয়া গেলেও মানব গবেষণার সমন্বিত বিশ্লেষণে জ্ঞানীয় ক্ষমতা বৃদ্ধির ধারাবাহিক ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাই স্মৃতিভ্রংশ বা আলঝেইমার রোগের চিকিৎসা হিসেবে এটি প্রতিষ্ঠিত নয়। [6, 7]

৪.৫ মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও মনোযোগ

স্নায়ুতন্ত্রের উত্তেজনা ও চাপের প্রতিক্রিয়ায় সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে ছোট আকারের মানব গবেষণা এবং প্রাণী গবেষণা হয়েছে। কিছু গবেষণায় মনোযোগ বা মানসিক অবস্থার নির্দিষ্ট পরিমাপে পরিবর্তন দেখা গেলেও ফল একরকম নয়। অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা, প্রস্তুতি ও পরীক্ষার সময়কাল ভিন্ন হওয়ায় উদ্বেগ বা বিষণ্নতার স্বীকৃত চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার সমর্থিত নয়। [7]

৪.৬ প্রদাহবিরোধী কার্যকারিতা

এশিয়াটিক অ্যাসিডসহ কয়েকটি ট্রাইটারপিন প্রদাহের সঙ্গে সম্পর্কিত রাসায়নিক বার্তা ও কোষীয় সংকেতের কার্যক্রম কমাতে পারে বলে পরীক্ষামূলক গবেষণায় দেখা গেছে। বিশেষত প্রদাহজনিত সংকেতের কিছু ধাপ এবং প্রদাহ-সংশ্লিষ্ট পদার্থের উৎপাদনের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে গবেষণা হয়েছে। মানুষের নির্দিষ্ট প্রদাহজনিত রোগে কার্যকারিতা প্রতিষ্ঠার জন্য পর্যাপ্ত উচ্চমানের পরীক্ষা প্রয়োজন। [5, 6]

৪.৭ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট কার্যকারিতা

থানকুনির ফেনলিক যৌগ ও ট্রাইটারপিন কোষের জারণজনিত ক্ষতি কমাতে এবং নিজস্ব প্রতিরক্ষামূলক এনজাইমের কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে। পরীক্ষাগার ও প্রাণী গবেষণায় এ ধরনের ফল দেখা গেলেও মানুষের শরীরে একই মাত্রার উপকার হবে কি না তা স্পষ্ট নয়। পরীক্ষাগারে মুক্তমূলক নিষ্ক্রিয় করার ক্ষমতা সরাসরি রোগ প্রতিরোধের প্রমাণ নয়। [5, 6]

৪.৮ স্নায়ু সুরক্ষা

প্রাণী ও কোষভিত্তিক গবেষণায় থানকুনির কিছু যৌগ স্নায়ুকোষের জারণজনিত চাপ, প্রদাহ এবং কোষমৃত্যুর সঙ্গে যুক্ত প্রক্রিয়ায় প্রভাব দেখিয়েছে। স্নায়ুর অবক্ষয়জনিত রোগে এসব ফল গবেষণার নতুন দিক তৈরি করলেও মানুষের আলঝেইমার বা পারকিনসন রোগ প্রতিরোধ বা চিকিৎসায় নির্ভরযোগ্য প্রমাণ এখনো অপর্যাপ্ত। [6, 7]

৪.৯ অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল কার্যকারিতা

থানকুনির বিভিন্ন নির্যাস কিছু ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকের বিরুদ্ধে পরীক্ষাগারে বৃদ্ধি-নিরোধী প্রভাব দেখিয়েছে। তবে নির্যাসের দ্রাবক, ঘনত্ব ও জীবাণুর প্রজাতি অনুযায়ী ফল বদলায়। পরীক্ষাগারে কার্যকারিতা পাওয়া মানেই মানুষের সংক্রমণে নিরাপদ ও কার্যকর চিকিৎসা নয়। অ্যান্টিবায়োটিকের বিকল্প হিসেবে এর ব্যবহার প্রতিষ্ঠিত হয়নি। [5, 6]

৪.১০ রক্তে শর্করা ও বিপাকীয় স্বাস্থ্য

প্রাণী গবেষণায় কিছু নির্যাস রক্তে শর্করা, জারণজনিত ক্ষতি এবং বিপাকীয় প্রদাহের নির্দিষ্ট সূচকে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে। সক্রিয় যৌগের পরিমাণ, নির্যাসের ধরন ও পরীক্ষার মডেলভেদে ফল ভিন্ন। ডায়াবেটিসে নিয়মিত ওষুধের পরিবর্তে থানকুনি ব্যবহারের পক্ষে পর্যাপ্ত মানব গবেষণা নেই। [5, 6]

৪.১১ যকৃতের ওপর প্রভাব

কিছু পরীক্ষামূলক গবেষণায় যকৃতের কোষে জারণজনিত ক্ষতি কমানোর সম্ভাবনা পাওয়া গেছে। অন্যদিকে থানকুনিসংশ্লিষ্ট ভেষজ প্রস্তুতি ব্যবহারের পর বিরল যকৃতের ক্ষতির ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে। তাই পরীক্ষামূলক যকৃত সুরক্ষার ফলকে মানুষের জন্য নিরাপত্তার নিশ্চয়তা হিসেবে দেখা যাবে না। পূর্ববিদ্যমান যকৃতের রোগে চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরি। [8]

৪.১২ হৃদ্‌যন্ত্র ও রক্তনালির ওপর প্রভাব

ক্ষুদ্র রক্তনালির স্থিতিশীলতা, প্রদাহ ও জারণজনিত ক্ষতির ওপর সম্ভাব্য প্রভাব থানকুনির রক্তনালি-সম্পর্কিত গবেষণার ভিত্তি। তবে শিরাজনিত উপসর্গে সীমিত মানব গবেষণার ফলকে হৃদ্‌রোগ প্রতিরোধ বা উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যায় না। [4]

৪.১৩ ক্যানসারবিরোধী গবেষণা

কিছু পৃথক যৌগ নিয়ে কোষভিত্তিক গবেষণায় ক্যানসার কোষের বৃদ্ধি ও কোষমৃত্যু-সম্পর্কিত প্রক্রিয়ায় প্রভাব পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। পরীক্ষাগারের এসব ফল প্রাথমিক এবং রোগীর চিকিৎসায় কার্যকারিতা প্রমাণ করে না। ক্যানসারের প্রচলিত চিকিৎসা বন্ধ বা বিলম্বিত করার কোনো ভিত্তি নেই। [5, 6]

৪.১৪ অন্যান্য প্রাথমিক গবেষণা

পরিপাকতন্ত্র, রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার প্রতিক্রিয়া ও বিভিন্ন অঙ্গের জারণজনিত ক্ষতি নিয়ে থানকুনির নির্যাস ও পৃথক যৌগের প্রাথমিক গবেষণা রয়েছে। এগুলোর অধিকাংশই পরীক্ষাগার বা প্রাণীভিত্তিক। নির্দিষ্ট রোগে মানব গবেষণা ছাড়া চিকিৎসাগত দাবি করা সমীচীন নয়। [5, 6]

৫. প্রধান ফাইটোকেমিক্যাল ও তাদের কার্যকারিতা

৫.১ বিস্তারিত তথ্য

প্রধান দুটি যৌগের রাসায়নিক গঠন

Asiatic acid | C₃₀H₄₈O₅

রাসায়নিক গঠনের উৎস: PubChem, CID 119034

Asiaticoside | C₄₈H₇₈O₁₉

রাসায়নিক গঠনের উৎস: PubChem, CID 11954171

থানকুনির প্রধান গবেষণালব্ধ সক্রিয় উপাদানগুলোর মধ্যে ট্রাইটারপিন স্যাপোনিন ও ট্রাইটারপিন অ্যাসিড বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। একই উদ্ভিদের বিভিন্ন স্থান, মৌসুম ও নির্যাস প্রস্তুতির পদ্ধতি অনুযায়ী এসব যৌগের পরিমাণ পরিবর্তিত হয়। পৃথক যৌগের ফল সম্পূর্ণ উদ্ভিদের কার্যকারিতা প্রমাণ করে না। [5, 6]

টেবিল ২. থানকুনির প্রধান যৌগ ও তাদের কার্যকারিতা

প্রধান যৌগরাসায়নিক শ্রেণিগবেষণায় পর্যবেক্ষিত সম্ভাব্য কার্যকারিতা
এশিয়াটিকোসাইডট্রাইটারপিন স্যাপোনিনকোলাজেন উৎপাদন, ক্ষত নিরাময় ও ত্বকের পুনর্গঠন [2, 4]
মেডেক্যাসোসাইডট্রাইটারপিন স্যাপোনিনত্বকের পুনর্গঠন, প্রদাহ ও জারণজনিত ক্ষতি-সম্পর্কিত গবেষণা [2]
এশিয়াটিক অ্যাসিডট্রাইটারপিন অ্যাসিডপ্রদাহবিরোধী ও স্নায়ু সুরক্ষা-সম্পর্কিত প্রিক্লিনিক্যাল গবেষণা [2, 3]
মেডেক্যাসিক অ্যাসিডট্রাইটারপিন অ্যাসিডত্বক ও প্রদাহ-সম্পর্কিত প্রাথমিক গবেষণা [2]
বিভিন্ন ফেনলিক যৌগফেনলিক যৌগপরীক্ষাগারভিত্তিক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট কার্যকারিতা [3]

৬. ক্লিনিক্যাল প্রমাণ ও মানব গবেষণা

৬.১ বিস্তারিত তথ্য

থানকুনির সব সম্ভাব্য ঔষধি গুণের পক্ষে সমমানের মানব গবেষণা নেই। ক্ষত নিরাময় ও দীর্ঘস্থায়ী শিরাজনিত উপসর্গ নিয়ে তুলনামূলক বেশি মানব গবেষণা পাওয়া যায়। স্মৃতিশক্তি ও মানসিক অবস্থার গবেষণায় ফল মিশ্র; অন্যান্য বহু কার্যকারিতার প্রমাণ মূলত প্রিক্লিনিক্যাল। [2, 4, 7]

টেবিল ৩. থানকুনির মানব পরিক্ষা ও কার্যকারিতা

গবেষণার ক্ষেত্রমানব গবেষণার সারসংক্ষেপপ্রধান সীমাবদ্ধতা
ক্ষত নিরাময়২০২২ সালের পদ্ধতিগত পর্যালোচনায় চারটি মানব পরীক্ষা অন্তর্ভুক্ত [4]ক্ষতের ধরন ও প্রস্তুতির ভিন্নতা
শিরাজনিত উপসর্গ২০১৩ সালের পদ্ধতিগত পর্যালোচনায় আটটি গবেষণা পর্যালোচিত [5]পদ্ধতিগত মান ও প্রতিবেদনগত দুর্বলতা
স্মৃতিশক্তি ও মানসিক অবস্থা২০১৭ সালের পদ্ধতিগত পর্যালোচনা ও সমন্বিত বিশ্লেষণে জ্ঞানীয় উন্নতির ধারাবাহিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি [6]ছোট নমুনা ও ভিন্ন পরীক্ষা
অন্যান্য কার্যকারিতানির্ভরযোগ্য মানব প্রমাণ সীমিত বা অনুপস্থিত [2, 3]প্রাণী ও পরীক্ষাগারের ফল মানুষের ক্ষেত্রে অনিশ্চিত

৭. ঔষধি প্রস্তুতি, প্রয়োগ ও মাত্রা

৭.১ বিস্তারিত তথ্য

থানকুনি খাদ্য হিসেবে তাজা পাতা, ঐতিহ্যগতভাবে পাতার রস বা বাটা এবং গবেষণায় শুকনো গুঁড়া, জলীয় বা মিশ্র দ্রাবকে প্রস্তুত নির্যাস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ত্বকের জন্য মলম, ক্রিম ও জেলজাত প্রস্তুতিও গবেষণায় ব্যবহৃত হয়েছে। গবেষণায় ব্যবহৃত নির্যাসের সক্রিয় উপাদান ও মাত্রা এক নয়; তাই একটি পরীক্ষার মাত্রা অন্য প্রস্তুতির জন্য গ্রহণযোগ্য নয়। নির্দিষ্ট রোগের জন্য সর্বজনস্বীকৃত নিরাপদ ও কার্যকর মাত্রা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ক্ষতস্থানে অপরিশোধিত পাতা বা অপরিচ্ছন্ন প্রস্তুতি প্রয়োগ করলে সংক্রমণের ঝুঁকি থাকতে পারে। [2, 3]

৮. পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও বিষক্রিয়া

৮.১ বিস্তারিত তথ্য

মুখে গ্রহণের পর কারও কারও পেটের অস্বস্তি, মাথাব্যথা বা তন্দ্রার মতো সমস্যা হতে পারে। ত্বকে প্রয়োগের ক্ষেত্রে চুলকানি, লালচে ভাব বা সংস্পর্শজনিত অ্যালার্জি দেখা দিতে পারে। বিরল ক্ষেত্রে যকৃতের ক্ষতির প্রতিবেদন রয়েছে; যদিও সব ঘটনায় এককভাবে থানকুনিই কারণ ছিল কি না, তা নিশ্চিত করা কঠিন। চোখ বা ত্বক হলুদ হওয়া, গাঢ় প্রস্রাব, অস্বাভাবিক দুর্বলতা বা দীর্ঘস্থায়ী বমিভাব দেখা দিলে ব্যবহার বন্ধ করে চিকিৎসা নেওয়া উচিত। দীর্ঘমেয়াদি ও উচ্চমাত্রার ব্যবহারের নিরাপত্তা যথেষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। [8, 3]

৯. সতর্কতা, নিষেধাজ্ঞা ও ওষুধের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া

৯.১ বিস্তারিত তথ্য

গর্ভাবস্থা ও স্তন্যদানের সময় ঔষধি মাত্রায় থানকুনি ব্যবহারের নিরাপত্তা সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য নেই। শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং যকৃত বা বৃক্কের রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। তন্দ্রা সৃষ্টি করে এমন ওষুধ বা যকৃতের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে এমন ওষুধের সঙ্গে সম্ভাব্য মিথস্ক্রিয়ার বিষয়টি চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টকে জানানো উচিত; নির্দিষ্ট মিথস্ক্রিয়ার মানবভিত্তিক প্রমাণ সীমিত। খাদ্য হিসেবে স্বাভাবিক পরিমাণে গ্রহণ এবং ঘন নির্যাসের ঔষধি ব্যবহারকে এক হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। [8, 3]

১০. শোষণ, বিপাক ও জৈবপ্রাপ্যতা

১০.১ বিস্তারিত তথ্য

থানকুনির প্রধান ট্রাইটারপিন যৌগগুলোর শোষণ ও বিপাক তাদের রাসায়নিক গঠন এবং প্রস্তুতির ধরন অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে। পরীক্ষামূলক গবেষণায় অন্ত্রের শোষণ, বিপাকের ফলে যৌগের রূপান্তর এবং শরীরে কার্যকর ঘনত্বে পৌঁছানোর সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা রয়েছে। তবে বিভিন্ন প্রস্তুতির জন্য মানুষের শরীরে নির্ভরযোগ্য শোষণ, বণ্টন ও নির্গমনসংক্রান্ত তথ্য অসম্পূর্ণ। ফলে পরীক্ষাগারে কার্যকর ঘনত্ব মানুষের শরীরে নিরাপদে অর্জন করা সম্ভব কি না, তা পৃথকভাবে যাচাই করতে হয়। [6]

১১. নির্যাসের মান নিয়ন্ত্রণ ও বিশুদ্ধতা

১১.১ বিস্তারিত তথ্য

বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও ঔষধি প্রস্তুতির জন্য সঠিক প্রজাতি শনাক্তকরণ, সংগ্রহস্থল নথিভুক্ত করা এবং পরীক্ষিত উদ্ভিদের নমুনা সংরক্ষণ জরুরি। পাতা বা সম্পূর্ণ উদ্ভিদের রাসায়নিক উপাদান মৌসুম, মাটি, শুকানোর পদ্ধতি ও ব্যবহৃত দ্রাবকের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে। এশিয়াটিকোসাইড ও মেডেক্যাসোসাইডের মতো চিহ্নিত যৌগের পরিমাণ বিশ্লেষণ করে প্রস্তুতির মান তুলনা করা যায়। পাশাপাশি ভারী ধাতু, কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ, ক্ষতিকর জীবাণু ও অন্য উদ্ভিদের মিশ্রণ পরীক্ষা করা প্রয়োজন। [5, 3]

১২. বৈজ্ঞানিক সীমাবদ্ধতা ও গবেষণার ঘাটতি

১২.১ বিস্তারিত তথ্য

থানকুনির ওপর বহু পরীক্ষামূলক গবেষণা থাকলেও মানুষের ওপর বড় আকারের, দীর্ঘমেয়াদি ও যথাযথ তুলনামূলক পরীক্ষা সীমিত। অনেক গবেষণায় নির্যাসের রাসায়নিক মান, সুনির্দিষ্ট মাত্রা বা দীর্ঘমেয়াদি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া পর্যাপ্তভাবে বর্ণিত হয়নি। একই রোগে ব্যবহৃত প্রস্তুতি ও ফল পরিমাপের পদ্ধতি ভিন্ন হওয়ায় গবেষণাগুলো সরাসরি তুলনা করা কঠিন। ভবিষ্যৎ গবেষণায় মাননিয়ন্ত্রিত প্রস্তুতি, পর্যাপ্ত অংশগ্রহণকারী, নির্ভরযোগ্য ফল পরিমাপ এবং যকৃতসহ বিভিন্ন অঙ্গের নিরাপত্তা মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ। [2, 4, 7, 8]

১৩. সামগ্রিক বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন

১৩.১ বিস্তারিত তথ্য

থানকুনির ক্ষত নিরাময় ও দীর্ঘস্থায়ী শিরাজনিত উপসর্গে সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে কিছু মানব গবেষণা রয়েছে, যদিও নিশ্চিত সিদ্ধান্তের জন্য আরও উন্নত প্রমাণ প্রয়োজন। স্মৃতিশক্তি ও মানসিক অবস্থার ক্ষেত্রে মানব গবেষণার ফল মিশ্র। প্রদাহবিরোধী, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, স্নায়ু সুরক্ষা, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ও বিপাকীয় কার্যকারিতার অধিকাংশ প্রমাণ পরীক্ষাগার ও প্রাণীভিত্তিক। বিরল যকৃতের ক্ষতির প্রতিবেদন এবং দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার ঘাটতি বিবেচনায় ঔষধি নির্যাস ব্যবহারে সতর্কতা প্রয়োজন। [2, 4, 7, 8, 3]

তথ্য সংযোজন: Nirjas
গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা

এই তথ্য শিক্ষামূলক। পরীক্ষামূলক কার্যকারিতা মানুষের চিকিৎসায় প্রমাণিত কার্যকারিতার সমান নয়।

তথ্যসূত্র

  1. Royal Botanic Gardens, Kew. Plants of the World Online: Centella asiatica (L.) Urb. https://powo.science.kew.org/taxon/1197718-2 ওয়েব লিংক ↗
  2. Elena Arribas-López, Nazanin Zand, Omorogieva Ojo, Martin John Snowden, Tony Kochhar. A Systematic Review of the Effect of Centella asiatica on Wound Healing. International Journal of Environmental Research and Public Health. 2022 DOI: 10.3390/ijerph19063266 ওয়েব লিংক ↗
  3. European Medicines Agency. European Union herbal monograph and assessment report on Centella asiatica (L.) Urb., herba, Revision 1. 2022. https://www.ema.europa.eu/en/medicines/herbal/centellae-asiaticae-herba. 2022 ওয়েব লিংক ↗
  4. Nyuk Jet Chong, Zoriah Aziz. A Systematic Review of the Efficacy ofCentella asiaticafor Improvement of the Signs and Symptoms of Chronic Venous Insufficiency. Evidence-Based Complementary and Alternative Medicine. 2013 DOI: 10.1155/2013/627182 ওয়েব লিংক ↗
  5. Shinjini Bandopadhyay, Sujata Mandal, Mimosa Ghorai, Niraj Kumar Jha, Manoj Kumar, Radha, Arabinda Ghosh, Jarosław Proćków, José M. Pérez de la Lastra, Abhijit Dey. Therapeutic properties and pharmacological activities of asiaticoside and madecassoside: A review. Journal of Cellular and Molecular Medicine. 2023 DOI: 10.1111/jcmm.17635 ওয়েব লিংক ↗
  6. Ziliang He, Yeye Hu, Zhiqiang Niu, Kang Zhong, Tingwu Liu, Meng Yang, Lilian Ji, Weicheng Hu. A review of pharmacokinetic and pharmacological properties of asiaticoside, a major active constituent of Centella asiatica (L.) Urb.. Journal of Ethnopharmacology. 2023 DOI: 10.1016/j.jep.2022.115865 ওয়েব লিংক ↗
  7. Panupong Puttarak, Piyameth Dilokthornsakul, Surasak Saokaew, Teerapon Dhippayom, Chuenjid Kongkaew, Rosarin Sruamsiri, Anchalee Chuthaputti, Nathorn Chaiyakunapruk. Effects of Centella asiatica (L.) Urb. on cognitive function and mood related outcomes: A Systematic Review and Meta-analysis. Scientific Reports. 2017 DOI: 10.1038/s41598-017-09823-9 ওয়েব লিংক ↗
  8. National Institute of Diabetes and Digestive and Kidney Diseases. Centella asiatica. LiverTox: Clinical and Research Information on Drug-Induced Liver Injury. NCBI Bookshelf. https://www.ncbi.nlm.nih.gov/books/NBK603561/ ওয়েব লিংক ↗