উদ্ভিদ

অ্যালোভেরা

অ্যালোভেরা বা ঘৃতকুমারী (Aloe vera) একটি বহুল পরিচিত ঔষধি উদ্ভিদ, যার পাতার স্বচ্ছ জেল ত্বকের যত্ন, ক্ষত নিরাময় ও পোড়া স্থানের পরিচর্যায় ঐতিহ্যগতভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এর প্রধান সক্রিয় উপাদানের মধ্যে অ্যাসিম্যানান, গ্লুকোম্যানান, অ্যালোইন, অ্যালো-ইমোডিন ও বিভিন্ন ফেনলিক যৌগ উল্লেখযোগ্য। অ্যালোভেরার ক্ষত নিরাময়, প্রদাহবিরোধী, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল এবং রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা হয়েছে। কিছু মানব গবেষণায় ত্বক ও ক্ষত পরিচর্যায় সম্ভাব্য উপকার পাওয়া গেলেও অধিকাংশ ঔষধি কার্যকারিতার প্রমাণ এখনো সীমিত। বিশেষত পাতার হলুদ ল্যাটেক্স মুখে গ্রহণ করলে পেটব্যথা, ডায়রিয়া ও অন্যান্য গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে। তাই জেল ও ল্যাটেক্সের ব্যবহার এবং নিরাপত্তার পার্থক্য বিবেচনা করা জরুরি।

১. উদ্ভিদের পরিচিতি

১.১ বিস্তারিত তথ্য

অ্যালোভেরা

অ্যালোভেরা বাংলাদেশের বাগান ও বসতবাড়িতে চাষ করা পরিচিত রসালো, বহুবর্ষজীবী ঔষধি উদ্ভিদ। এর মোটা, বর্শাকৃতি, সবুজ থেকে ধূসর-সবুজ পাতা গোড়ায় গুচ্ছাকারে জন্মায়; পাতার কিনারায় ছোট দাঁতের মতো অংশ থাকে। পাতার ভেতরের স্বচ্ছ শ্লেষ্মাযুক্ত জেলে প্রচুর পানি ও জটিল শর্করা থাকে। পাতার বাইরের আবরণের নিচে হলুদ, তিক্ত ল্যাটেক্স থাকে, যা জেলের চেয়ে রাসায়নিকভাবে ও নিরাপত্তার দিক থেকে ভিন্ন। অনুকূল পরিবেশে লম্বা মঞ্জরিতে নলাকার হলুদ বা কমলা ফুল দেখা যেতে পারে। ঔষধি গবেষণায় পাতার জেল, পৃথক ল্যাটেক্স এবং সম্পূর্ণ পাতার নির্যাস ব্যবহৃত হয়। কোন অংশ ব্যবহার করা হয়েছে, তা উল্লেখ না করলে গবেষণার ফল সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না। [1, 2, 3]

টেবিল ১. অ্যালোভেরার উদ্ভিদ পরিচিতি

পরিচিতির বিষয়তথ্য
বাংলা নামঅ্যালোভেরা, ঘৃতকুমারী
ইংরেজি নামAloe vera
স্বীকৃত বৈজ্ঞানিক নামAloe vera (L.) Burm.f.
বহুল ব্যবহৃত সমার্থক নামAloe barbadensis Mill.
পরিবারAsphodelaceae
গণAloe
প্রজাতিA. vera
বর্গAsparagales
উদ্ভিদের ধরনরসালো, বহুবর্ষজীবী ভেষজ উদ্ভিদ
ব্যবহৃত অংশপাতার ভেতরের স্বচ্ছ জেল; পৃথক হলুদ ল্যাটেক্স; প্রক্রিয়াজাত সম্পূর্ণ পাতার নির্যাস
বাংলাদেশে প্রাপ্যতাবসতবাড়ি, বাগান ও বাণিজ্যিক চাষে

২. প্রধান ঔষধি গুণ

২.১ বিস্তারিত তথ্য

অ্যালোভেরার সর্বাধিক পরিচিত ব্যবহার ত্বকের যত্ন ও হালকা পোড়ায় স্থানীয়ভাবে জেল প্রয়োগ। কিছু মানব গবেষণায় পোড়ার ক্ষত সারা এবং ব্যথা কমার সম্ভাবনা দেখা গেছে, কিন্তু বিভিন্ন ধরনের তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত নিয়ে সমন্বিত পর্যালোচনায় উচ্চমানের নির্ভরযোগ্য প্রমাণ অপর্যাপ্ত। গভীর, সংক্রমিত বা বিস্তৃত ক্ষতে অ্যালোভেরা প্রচলিত চিকিৎসার বিকল্প নয়। [3, 4]

মুখের শ্লৈষ্মিক ঝিল্লির কিছু প্রদাহজনিত সমস্যায়, বিশেষত মুখের লাইকেন প্ল্যানাসে, স্থানীয় জেল নিয়ে মানব গবেষণা হয়েছে। কয়েকটি পরীক্ষায় উপসর্গের উন্নতির ইঙ্গিত থাকলেও সমন্বিত বিশ্লেষণে ফলের অসামঞ্জস্য রয়েছে। ত্বকের আর্দ্রতা রক্ষা, প্রদাহ নিয়ন্ত্রণ, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল কার্যকারিতা নিয়ে প্রধানত পরীক্ষাগার ও ছোট আকারের গবেষণা হয়েছে। [3, 5, 6]

মুখে গ্রহণযোগ্য নির্দিষ্ট কিছু প্রক্রিয়াজাত জেলজাত প্রস্তুতি নিয়ে রক্তে শর্করা ও বিপাকীয় স্বাস্থ্যের প্রাথমিক মানব গবেষণা রয়েছে; ফল সব প্রস্তুতির জন্য প্রযোজ্য নয়। বিপরীতে হলুদ ল্যাটেক্সে থাকা অ্যানথ্রাকুইনোনজাত যৌগ শক্তিশালী রেচক হলেও ডায়রিয়া, পানিশূন্যতা ও রক্তের পটাশিয়াম কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। অপ্রক্রিয়াজাত সম্পূর্ণ পাতার নির্যাসের ক্যানসারজনিত সম্ভাব্য ঝুঁকি আলাদাভাবে বিবেচ্য। [3, 7]

৩. ঐতিহ্যগত ও প্রচলিত ব্যবহার

৩.১ বিস্তারিত তথ্য

দক্ষিণ এশিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলে অ্যালোভেরার পাতার স্বচ্ছ জেল ত্বক শীতল রাখা, হালকা পোড়া, শুষ্ক ত্বক ও চুলের যত্নে ব্যবহৃত হয়েছে। হলুদ ল্যাটেক্স ঐতিহ্যগতভাবে কোষ্ঠকাঠিন্যে রেচক হিসেবে ব্যবহৃত হলেও নিরাপত্তাজনিত কারণে এটি নিজে থেকে গ্রহণ করা উচিত নয়। ঐতিহ্যগত ব্যবহার কোনো নির্দিষ্ট রোগে চিকিৎসাগত কার্যকারিতা প্রতিষ্ঠা করে না; ঘরোয়া পাতায় জেলের সঙ্গে ল্যাটেক্স মিশে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। [2, 3, 5]

৪. বিস্তারিত ঔষধি কার্যকারিতা ও সম্ভাব্য কার্যপ্রক্রিয়া

৪.১ হালকা পোড়া ও ক্ষত নিরাময়

জেলের জটিল শর্করা, বিশেষত অ্যাসেম্যানান, ক্ষতস্থানের কোষীয় প্রতিক্রিয়া, আর্দ্র পরিবেশ ও সংযোজক কলা গঠনের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখতে পারে। কিছু ছোট মানব পরীক্ষায় হালকা পোড়ায় উপকারের ইঙ্গিত আছে। তবে তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত নিয়ে কোখরেন পর্যালোচনায় সাতটি পরীক্ষা ও ৩৪৭ জন অংশগ্রহণকারীর তথ্য থেকে নিশ্চিত কার্যকারিতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি; কিছু পরীক্ষায় ফল বিপরীতও ছিল। গভীর বা সংক্রমিত ক্ষতে চিকিৎসা বিলম্ব করা যাবে না। [2, 3, 4]

৪.২ ত্বকের আর্দ্রতা ও প্রতিবন্ধক সুরক্ষা

স্বচ্ছ জেলে প্রচুর পানি ও জলধারণক্ষম জটিল শর্করা থাকায় ত্বকের উপরিভাগে আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করতে পারে। প্রসাধনীতে জেল, ক্রিম ও মিশ্র প্রস্তুতির ব্যবহার রয়েছে। তবে প্রস্তুতির ঘনত্ব, সংরক্ষক ও অন্যান্য উপাদান ভেদে ফল বদলায়; অ্যালোভেরা-যুক্ত সব পণ্যকে সমান কার্যকর বলা যায় না। সংবেদনশীল ত্বকে অ্যালার্জি বা জ্বালা হতে পারে। [2, 3, 5]

৪.৩ প্রদাহবিরোধী কার্যকারিতা

পরীক্ষাগারে অ্যালোভেরার কিছু জেল উপাদান প্রদাহ-সংশ্লিষ্ট সংকেত ও রাসায়নিক মধ্যস্থতাকারীর ওপর প্রভাব দেখিয়েছে। এই প্রভাবের সম্ভাব্য ব্যাখ্যায় কোষীয় সংকেত, জারণজনিত চাপ এবং প্রতিরক্ষা কোষের প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তন অন্তর্ভুক্ত। পৃথক যৌগের পরীক্ষাগার ফলকে পুরো জেলের মানুষের রোগে কার্যকারিতার প্রমাণ হিসেবে গণ্য করা যায় না। [2, 5]

৪.৪ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট কার্যকারিতা

জেলের বিভিন্ন ফেনলিক ও অন্যান্য যৌগ পরীক্ষাগারে মুক্তমূলক নিষ্ক্রিয়করণ এবং জারণজনিত ক্ষতির সূচকে প্রভাব দেখাতে পারে। নির্যাস তৈরির পদ্ধতি ও পাতার বয়সে এই ক্ষমতা পরিবর্তিত হয়। মানুষের শরীরে গ্রহণের পর একই কার্যকর ঘনত্ব পাওয়া যায় কি না এবং রোগের ফল পরিবর্তিত হয় কি না, তা প্রতিষ্ঠিত নয়। [2, 5]

৪.৫ মুখের লাইকেন প্ল্যানাস ও মুখগহ্বরের ক্ষত

মুখের লাইকেন প্ল্যানাসে স্থানীয় অ্যালোভেরা জেল বা মুখে প্রয়োগযোগ্য প্রস্তুতি নিয়ে তুলনামূলক পরীক্ষা হয়েছে। একটি ৬৪ জনের পরীক্ষায় কিছু জীবনমান সূচকে উন্নতি হলেও ব্যথার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পাওয়া যায়নি। ২০১৭ সালের পদ্ধতিগত পর্যালোচনায় সম্ভাব্য উপকারের প্রমাণ দুর্বল এবং গবেষণাগুলোর ফল অসম ছিল। মুখের দীর্ঘস্থায়ী ঘা বা সাদা দাগে চিকিৎসকের মূল্যায়ন জরুরি। [6, 8]

৪.৬ ব্রণ ও অন্যান্য ত্বকের সমস্যা

কয়েকটি ছোট মানব গবেষণায় প্রচলিত চিকিৎসার সঙ্গে অ্যালোভেরা জেল ব্যবহারে ব্রণের উপসর্গে সম্ভাব্য উপকার পাওয়া গেছে। এতে আর্দ্রতা রক্ষা ও প্রদাহ-সম্পর্কিত প্রভাব ভূমিকা রাখতে পারে, কিন্তু পৃথকভাবে অ্যালোভেরার অবদান নির্ধারণ কঠিন। একজিমা, সোরিয়াসিস ও বিকিরণজনিত ত্বকক্ষতিতে ফল সীমিত বা অসামঞ্জস্যপূর্ণ। [3, 5]

৪.৭ অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল কার্যকারিতা

পাতার বিভিন্ন নির্যাস পরীক্ষাগারে কিছু ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকের বিরুদ্ধে বৃদ্ধি-নিরোধী প্রভাব দেখিয়েছে। দ্রাবক, ঘনত্ব, ব্যবহৃত উদ্ভিদাংশ ও জীবাণুর ধরন অনুযায়ী ফল ভিন্ন হয়। মানুষের সংক্রমণে কার্যকর মাত্রা, নিরাপত্তা ও ক্লিনিক্যাল উপকার প্রতিষ্ঠিত নয়; অ্যান্টিবায়োটিক বা ছত্রাকরোধী ওষুধের বিকল্প নয়। [2, 5]

৪.৮ রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ

নির্দিষ্ট কিছু মুখে গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়াজাত জেল নিয়ে ছোট মানব গবেষণায় রক্তে শর্করা ও দীর্ঘমেয়াদি শর্করা নিয়ন্ত্রণের সূচকে সম্ভাব্য উন্নতি পাওয়া গেছে। তবে নমুনা ছোট, প্রস্তুতি ভিন্ন এবং দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা অসম্পূর্ণ। ডায়াবেটিসের ওষুধের সঙ্গে একত্রে গ্রহণ করলে শর্করা অতিরিক্ত কমার সম্ভাবনা বিবেচনা করতে হয়। ল্যাটেক্স বা অপরিশোধিত পাতার রসের জন্য এসব ফল প্রযোজ্য নয়। [3, 9]

৪.৯ রক্তে চর্বি ও বিপাকীয় স্বাস্থ্য

কিছু ছোট গবেষণায় নির্দিষ্ট প্রক্রিয়াজাত প্রস্তুতি গ্রহণের পর রক্তে চর্বি, ওজন বা বিপাকীয় সূচকে পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। খাদ্যাভ্যাস, অন্যান্য চিকিৎসা এবং প্রস্তুতির রাসায়নিক পার্থক্য ফল ব্যাখ্যায় গুরুত্বপূর্ণ। হৃদ্‌রোগ প্রতিরোধ বা স্থূলতার প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসা হিসেবে ব্যবহারের মতো প্রমাণ নেই। [3, 9]

৪.১০ পরিপাকতন্ত্র ও রেচক প্রভাব

পাতার হলুদ ল্যাটেক্সে থাকা অ্যালোইনজাত যৌগ অন্ত্রের চলন ও তরল নিঃসরণ বাড়িয়ে রেচক প্রভাব সৃষ্টি করে। এটি জেলের পুষ্টিগত বা ত্বক-সম্পর্কিত ব্যবহার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। তীব্র পেটব্যথা, ডায়রিয়া, পানিশূন্যতা, পটাশিয়াম হ্রাস ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারে জটিলতার কারণে নিজে থেকে ল্যাটেক্স গ্রহণ অনিরাপদ। [3, 7]

৪.১১ রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার প্রতিক্রিয়া

অ্যাসেম্যানানসহ কিছু জটিল শর্করা পরীক্ষাগারে প্রতিরক্ষা কোষের সক্রিয়তা ও সংকেতের ওপর প্রভাব দেখিয়েছে। তবে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা উদ্দীপিত হওয়া সব রোগে উপকারী নয়, এবং কোষের পরীক্ষার ফল মানুষের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ার প্রমাণ নয়। নির্দিষ্ট রোগে মাননিয়ন্ত্রিত মানব গবেষণা প্রয়োজন। [2, 5]

৪.১২ যকৃত ও বৃক্কের ওপর প্রভাব

কিছু প্রাণী গবেষণায় জারণজনিত ক্ষতির নির্দিষ্ট সূচকে পরিবর্তন দেখা গেলেও মানুষের যকৃত বা বৃক্কের রোগের চিকিৎসায় অ্যালোভেরার কার্যকারিতা প্রতিষ্ঠিত নয়। মুখে গ্রহণযোগ্য অ্যালোভেরা-সম্পর্কিত প্রস্তুতির সঙ্গে বিরল যকৃতের ক্ষতির প্রতিবেদন রয়েছে। পূর্ববিদ্যমান যকৃত বা বৃক্কের রোগে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। [3, 10]

৪.১৩ ক্যানসার-সম্পর্কিত গবেষণা ও ঝুঁকি

কোষভিত্তিক পরীক্ষায় কিছু পৃথক যৌগের ক্যানসার কোষের ওপর প্রভাব গবেষণা করা হয়েছে, কিন্তু রোগীর চিকিৎসায় অ্যালোভেরার ক্যানসারবিরোধী কার্যকারিতা প্রতিষ্ঠিত নয়। বিপরীতে প্রাণী গবেষণার ভিত্তিতে অপ্রক্রিয়াজাত সম্পূর্ণ পাতার নির্যাসকে আন্তর্জাতিক ক্যানসার গবেষণা সংস্থা মানুষের জন্য সম্ভাব্য ক্যানসারসৃষ্টিকারী হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে; এটি বিশুদ্ধ স্থানীয় জেলের সমার্থক নয়। [3, 7]

৪.১৪ অন্যান্য প্রাথমিক গবেষণা

ত্বকের দাগ, মুখের অন্যান্য প্রদাহজনিত সমস্যা, কোষীয় পুনর্গঠন ও বিভিন্ন জারণজনিত অবস্থায় অ্যালোভেরার নির্যাস ও পৃথক যৌগ নিয়ে গবেষণা রয়েছে। অনেক ফল নির্দিষ্ট পরীক্ষাগার পদ্ধতি, প্রাণী মডেল বা ছোট মানব পরীক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ। উদ্ভিদের অংশ, প্রস্তুতি ও কার্যকর উপাদানের পরিমাণ স্পষ্ট না থাকলে ফল সাধারণীকরণ করা যায় না। [2, 3, 5]

৫. প্রধান ফাইটোকেমিক্যাল ও তাদের কার্যকারিতা

৫.১ বিস্তারিত তথ্য

অ্যালোভেরার জেলে পানির পাশাপাশি অ্যাসেম্যানানসহ জটিল শর্করা, গ্লুকোম্যানান এবং অল্প পরিমাণে ফেনলিক ও অন্যান্য যৌগ পাওয়া যায়। ল্যাটেক্সে অ্যালোইন এ ও বি-সহ অ্যানথ্রাকুইনোনজাত যৌগের উপস্থিতি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। পুরো পাতার রাসায়নিক গঠন জেল থেকে আলাদা। একই নামের পণ্যে ব্যবহৃত অংশ, পরিশোধন ও সংরক্ষণ-পদ্ধতির পার্থক্য থাকতে পারে। [2, 3] রাসায়নিক গঠনের নির্ভুল অঙ্কন যুক্ত করতে হলে নির্দিষ্ট যৌগের যাচাইকৃত গঠন-নথি ব্যবহার করা প্রয়োজন। এখানে পাতার অংশভেদ ও মান নিয়ন্ত্রণের চিত্র দেওয়া হয়েছে; এগুলো পৃথক অণুর রাসায়নিক গঠন নয়।

টেবিল ২. অ্যালোভেরার প্রধান যৌগ ও গবেষণায় পর্যবেক্ষিত সম্ভাব্য কার্যকারিতা

প্রধান যৌগরাসায়নিক শ্রেণি ও উৎসগবেষণায় পর্যবেক্ষিত প্রভাব
অ্যাসেম্যানানঅ্যাসিটাইলযুক্ত জটিল শর্করা; জেলকোষীয় প্রতিক্রিয়া, আর্দ্রতা ও ক্ষত-সম্পর্কিত প্রিক্লিনিক্যাল গবেষণা [2]
গ্লুকোম্যানানজটিল শর্করা; জেলজেল গঠন, জলধারণ ও কোষীয় প্রতিক্রিয়া [2]
অ্যালোইন এ ও বিঅ্যানথ্রোন গ্লাইকোসাইড; ল্যাটেক্সরেচক প্রভাব; মুখে গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ঝুঁকি [2, 3]
অ্যালো-ইমোডিনঅ্যানথ্রাকুইনোনজাত যৌগ; প্রধানত ল্যাটেক্স-সংশ্লিষ্টকোষভিত্তিক কার্যকারিতা ও বিষক্রিয়া-সম্পর্কিত গবেষণা [2, 7]
বিভিন্ন ফেনলিক যৌগফেনলিক শ্রেণি; অংশভেদে ভিন্নপরীক্ষাগারভিত্তিক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট কার্যকারিতা [2, 4]

৬. ক্লিনিক্যাল প্রমাণ ও মানব গবেষণা

৬.১ বিস্তারিত তথ্য

অ্যালোভেরার মানব গবেষণা মূলত হালকা পোড়া, ক্ষত, মুখগহ্বরের কিছু রোগ এবং নির্দিষ্ট মুখে গ্রহণযোগ্য প্রস্তুতির বিপাকীয় প্রভাব নিয়ে হয়েছে। গবেষণার প্রস্তুতি, নমুনার আকার ও ফল পরিমাপের ভিন্নতা গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা। স্থানীয় জেলের ফল থেকে ল্যাটেক্স বা সম্পূর্ণ পাতার নির্যাসের নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা অনুমান করা যাবে না। [3, 4, 6, 8]

টেবিল ৩. অ্যালোভেরার মানব গবেষণা ও প্রমাণের সীমাবদ্ধতা

গবেষণার ক্ষেত্রমানব গবেষণার সারসংক্ষেপপ্রধান সীমাবদ্ধতা
তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতকোখরেন পর্যালোচনায় ৭টি পরীক্ষা, ৩৪৭ জন; উচ্চমানের নির্ভরযোগ্য প্রমাণ অপর্যাপ্ত [5]ক্ষতের ধরন, প্রস্তুতি ও পক্ষপাতের ঝুঁকি
হালকা পোড়াকিছু মানব গবেষণায় ক্ষত সারা ও ব্যথায় সম্ভাব্য উপকার [3]ছোট পরীক্ষা ও অসম ফল
মুখের লাইকেন প্ল্যানাস৬৪ জনের পরীক্ষায় জীবনমানের কিছু সূচকে উন্নতি; ব্যথায় নিশ্চিত পার্থক্য নয় [8]প্রস্তুতি ও ফল পরিমাপের ভিন্নতা
মুখের লাইকেন প্ল্যানাস: সমন্বিত বিশ্লেষণ২০১৭ সালের পর্যালোচনায় প্রমাণ দুর্বল ও অসম [6]ছোট পরীক্ষা, তুলনাকারীর ভিন্নতা
রক্তে শর্করানির্দিষ্ট মুখে গ্রহণযোগ্য প্রস্তুতিতে সীমিত ইতিবাচক ইঙ্গিত [3, 9]প্রস্তুতি, মাত্রা ও দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার অনিশ্চয়তা

৭. ঔষধি প্রস্তুতি, প্রয়োগ ও মাত্রা

৭.১ বিস্তারিত তথ্য

স্থানীয় ব্যবহারে পরিশোধিত জেল, ক্রিম, লোশন ও বিশেষ ক্ষত-আবরণী ব্যবহৃত হয়। গবেষণায় মুখে গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়াজাত জেলজাত প্রস্তুতিও রয়েছে, কিন্তু তা ঘরে তৈরি পাতার রসের সমতুল্য নয়। রোগভেদে সব প্রস্তুতির জন্য একক নিরাপদ ও কার্যকর মাত্রা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। গভীর পোড়া বা সংক্রমিত ক্ষতে স্ব-চিকিৎসা অনুচিত। হলুদ ল্যাটেক্সকে ঘরোয়া রেচক হিসেবে গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন। [3, 4]

৮. পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও বিষক্রিয়া

৮.১ বিস্তারিত তথ্য

ত্বকে অ্যালোভেরা লাগানোর পর কিছু ব্যক্তির চুলকানি, জ্বালা, লালচে ভাব বা সংস্পর্শজনিত অ্যালার্জি হতে পারে। মুখে গ্রহণে প্রস্তুতি অনুযায়ী পেটের অস্বস্তি ও ডায়রিয়া হতে পারে। ল্যাটেক্সের রেচক প্রভাবে পানিশূন্যতা ও পটাশিয়াম কমে যাওয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্য। বিরল যকৃতের ক্ষতির প্রতিবেদনও রয়েছে। অপ্রক্রিয়াজাত সম্পূর্ণ পাতার নির্যাস নিয়ে প্রাণীভিত্তিক ক্যানসারজনিত উদ্বেগ আছে। [3, 7, 10]

৯. সতর্কতা, নিষেধাজ্ঞা ও ওষুধের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া

৯.১ বিস্তারিত তথ্য

গর্ভাবস্থা ও স্তন্যদানে মুখে গ্রহণযোগ্য ঔষধি প্রস্তুতির নিরাপত্তা পর্যাপ্তভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, অন্ত্রের প্রদাহজনিত রোগ এবং যকৃত বা বৃক্কের রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। ডায়াবেটিসের ওষুধের সঙ্গে মুখে গ্রহণযোগ্য কিছু প্রস্তুতি রক্তে শর্করা অতিরিক্ত কমাতে পারে। ল্যাটেক্সের কারণে পটাশিয়াম কমে গেলে মূত্রবর্ধক ওষুধ বা ডিগক্সিনের সঙ্গে ঝুঁকি বাড়তে পারে। সম্ভাব্য মিথস্ক্রিয়ার সব ক্ষেত্রে সরাসরি মানব প্রমাণ সমান নয়। [3, 7]

১০. শোষণ, বিপাক ও জৈবপ্রাপ্যতা

১০.১ বিস্তারিত তথ্য

জেলের বৃহৎ জটিল শর্করা ও ল্যাটেক্সের ক্ষুদ্র অ্যানথ্রাকুইনোনজাত যৌগের শোষণ ও বিপাক এক নয়। মুখে গ্রহণের পর ল্যাটেক্স-সংশ্লিষ্ট যৌগ অন্ত্রের জীবাণু ও বিপাকীয় প্রক্রিয়ায় রূপান্তরিত হয়ে রেচক প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে। জেলের বৃহৎ শর্করার ক্ষেত্রে অন্ত্রের ভেতরে স্থানীয় প্রভাব ও সম্ভাব্য বিপাকীয় পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ; পরীক্ষাগারে কার্যকর ঘনত্ব মানুষের শরীরে একইভাবে পাওয়া যায় কি না অনিশ্চিত। [2, 3]

১১. নির্যাসের মান নিয়ন্ত্রণ ও বিশুদ্ধতা

১১.১ বিস্তারিত তথ্য

সঠিক প্রজাতি শনাক্তকরণ, উদ্ভিদাংশের পৃথকীকরণ এবং নমুনা সংরক্ষণ মান নিয়ন্ত্রণের প্রথম ধাপ। জেলজাত প্রস্তুতিতে ল্যাটেক্সের অ্যালোইন অবশিষ্ট আছে কি না পরীক্ষা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি জীবাণু, ভারী ধাতু, কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ, সংরক্ষক ও প্রস্তুতির স্থায়িত্ব পরীক্ষা প্রয়োজন। একই পণ্যে ব্যবহৃত পাতার বয়স, সংগ্রহের সময়, উত্তোলন পদ্ধতি ও প্রক্রিয়াজাতকরণ নথিভুক্ত করা উচিত। [2, 3, 7]

১২. বৈজ্ঞানিক সীমাবদ্ধতা ও গবেষণার ঘাটতি

১২.১ বিস্তারিত তথ্য

বহু গবেষণায় ব্যবহৃত উদ্ভিদাংশ, অ্যালোইনের পরিমাণ, নির্যাসের রাসায়নিক মান এবং তুলনামূলক চিকিৎসার বিবরণ অপর্যাপ্ত। ত্বক ও মুখগহ্বরের গবেষণায় ছোট নমুনা ও ভিন্ন ফল পরিমাপের কারণে সিদ্ধান্ত সীমিত। মুখে গ্রহণযোগ্য প্রস্তুতির দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা এবং যকৃত ও অন্ত্রের ওপর প্রভাব আরও ভালোভাবে পরীক্ষা প্রয়োজন। ভবিষ্যৎ গবেষণায় জেল, ল্যাটেক্স ও সম্পূর্ণ পাতার নির্যাস পৃথকভাবে মূল্যায়ন অপরিহার্য। [3, 4, 6, 7]

১৩. সামগ্রিক বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন

১৩.১ বিস্তারিত তথ্য

অ্যালোভেরার পরিশোধিত স্থানীয় জেল ত্বকের যত্ন ও কিছু হালকা পোড়ায় সম্ভাব্য সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে; তবে সব ধরনের ক্ষত নিরাময়ে উচ্চমানের নিশ্চিত প্রমাণ নেই। মুখের কিছু প্রদাহজনিত সমস্যায় সীমিত মানব গবেষণা রয়েছে। অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল, রোগপ্রতিরোধ নিয়ন্ত্রণ ও অন্যান্য বহু কার্যকারিতার প্রমাণ মূলত প্রাথমিক। মুখে গ্রহণযোগ্য প্রস্তুতির ক্ষেত্রে উদ্ভিদাংশ ও প্রক্রিয়াজাতকরণভেদে নিরাপত্তার বড় পার্থক্য রয়েছে; বিশেষত ল্যাটেক্স ও অপ্রক্রিয়াজাত সম্পূর্ণ পাতার নির্যাসে সতর্কতা জরুরি। [3, 4, 6, 7]

তথ্য সংযোজন: Nirjas
গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা

এই তথ্য শিক্ষামূলক। পরীক্ষামূলক কার্যকারিতা মানুষের চিকিৎসায় প্রমাণিত কার্যকারিতার সমান নয়।

তথ্যসূত্র

  1. Royal Botanic Gardens, Kew. Aloe vera (L.) Burm.f. Plants of the World Online. https://powo.science.kew.org/taxon/urn:lsid:ipni.org:names:530017-1 ওয়েব লিংক ↗
  2. Josias H. Hamman. Composition and Applications of Aloe vera Leaf Gel. Molecules. 2008 DOI: 10.3390/molecules13081599 ওয়েব লিংক ↗
  3. National Center for Complementary and Integrative Health. Aloe Vera: Usefulness and Safety. https://www.nccih.nih.gov/health/aloe-vera ওয়েব লিংক ↗
  4. Anthony D Dat, Flora Poon, Kim BT Pham, Jenny Doust. Aloe vera for treating acute and chronic wounds. Cochrane Database of Systematic Reviews. 2012 DOI: 10.1002/14651858.cd008762.pub2 ওয়েব লিংক ↗
  5. Amar Surjushe, Resham Vasani, DG Saple. Aloe vera: A short review. Indian Journal of Dermatology. 2008 DOI: 10.4103/0019-5154.44785 ওয়েব লিংক ↗
  6. S Ali, W Wahbi. The efficacy of aloe vera in management of oral lichen planus: a systematic review and meta‐analysis. Oral Diseases. 2017 DOI: 10.1111/odi.12631 ওয়েব লিংক ↗
  7. IARC Working Group on the Evaluation of Carcinogenic Risks to Humans. Some Drugs and Herbal Products. IARC Monographs, Volume 108. 2016. https://www.ncbi.nlm.nih.gov/books/NBK350480/. 2016 ওয়েব লিংক ↗
  8. N. Salazar-Sánchez, P. López-Jornet, F. Camacho-Alonso, M. Sánchez-Siles. Efficacy of topical Aloe vera in patients with oral lichen planus: a randomized double-blind study. Journal of Oral Pathology & Medicine. 2010 DOI: 10.1111/j.1600-0714.2010.00947.x ওয়েব লিংক ↗
  9. National Center for Complementary and Integrative Health. Aloe Vera: Usefulness and Safety. Section on oral aloe and blood glucose. https://www.nccih.nih.gov/health/aloe-vera ওয়েব লিংক ↗
  10. National Institute of Diabetes and Digestive and Kidney Diseases. Aloe Vera. LiverTox: Clinical and Research Information on Drug-Induced Liver Injury. Updated May 24, 2022. NCBI Bookshelf ID: NBK548634. https://www.ncbi.nlm.nih.gov/books/NBK548634/. 2022 ওয়েব লিংক ↗